আজ বৃহস্পতিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ
শিরোনাম : মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় রোহিঙ্গা সংকটেও সারা বিশ্বের সমর্থন পেয়েছি : প্রধানমন্ত্রী       শৃঙ্খলাবিধির ফলে ন্যায়বিচার কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে : রিজভী       দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান : প্রধানমন্ত্রী       থার্টি ফার্স্টে বন্ধ থাকবে বার, বৈধ অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ       মগবাজার ফ্লাইওভারে চলন্ত বাসে আগুন       রাজধানীতে সেলুনে বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩       'আজেবাজে জিদ' করেন না মাশরাফি      
পাট চাষে লাভের মুখ দেখছে না কৃষক
Published : Monday, 18 September, 2017 at 7:32 PM, Count : 263
পাট চাষে লাভের মুখ দেখছে  না কৃষকবায়েজীদ মুন্সী : মৌসুমের শুরুতেই পাট বুনতে গিয়ে অনাবৃষ্টির কারণে বিপাকে পড়েছিলেন চাষিরা। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপায়ে সেচ দিতে হয়েছে তাদের। ফলে ব্যয় করতে হয়েছে ডিজেল ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ। পরবর্তীতে হাড় ভাঙা পরিশ্রম ও পর্যাপ্ত পানি পাওয়ায় পাটের ফলন ভালো দেখে হাসি ফুটেছিল কৃষকের মুখে। কিন্তু ফসল বিক্রি করতে গিয়ে সেই হাসি মুখে নিমেষেই নেমে এসেছে চরম হতাশা। কারণ উৎপাদন ভাল হলেও পাটের লাভের মুখ দেখছে না কৃষক।
 
জানা গেছে, স্বাভাবিকভাবেই এক বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করতে চাষিদের খরচ পড়ে কমপক্ষে ১২ হাজার টাকা। আর এ জমিতে ৮ থেকে ১০ মন পাট উৎপাদন হয়ে থাকে। তারওপর কৃত্রিম উপায়ে সেচ, পাট কাটা এবং আঁশ ছাড়ানোর খরচ মিলিয়ে উৎপদন খরচ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ১৭ হাজারে। অথচ বাজারে মান ভেদে প্রতিমন পাট বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪৫০ টাকা থেকে একহাজার ৬০০ টাকায়। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের সাথে আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে লাভের পরিবর্তে গুণতে হচ্ছে লোকসান। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, রাঙ্গামাটি ছাড়া দেশের সব অঞ্চলেই কম বেশি পাটের চাষ করা হয়। তবে ফরিদপুর, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলে পাটের চাষ বেশি হয়ে থাকে। চলতি বছর দেশে পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৭৭ লাখ বেল। আর এ জন্য সারা দেশে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৫৭ হাজার হেক্টর জমি। এর মধ্যে তোষা জাতের পাটের জন্য ৬ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর এবং দেশি জাতের পাটের জন্য ৬৫ হাজার হেক্টর। তোষা পাটের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭১ লাখ ৯৪ হাজার বেল। আর দেশি জাতের পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫৬ হাজার বেল। কিন্তু গত কয়েক বছর বিরূপ আবহাওয়া, অনাবৃষ্টি, সেচের মাধ্যমে পাট চাষে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ নানা কারনে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আবাদ করা হয়েছে। তবে এ বছর আবাদ কম হলেও ফলন অনেক ভালো হয়েছে। 

কিন্তু ফলন ভাল হলেও লাভের মুখ দেখছে না কৃষকরা। কেউ কেউ ফসল বিক্রি করে খরচের টাকা উঠিয়ে নিতে পারলেও অধিকাংশ চাষিরাই রয়েছে লোকসানে। 

রংপুর সংবাদদতা জানান, চলতি বছর রংপুর বিভাগে প্রায় এক লাখ মেট্রিকটন পাট উৎপন্ন হয়েছে। ফলন ভাল হলেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না উত্তরাঞ্চলের চাষিরা। বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) এর  আওতাধীন পাটকলগুলো ক্রয় বন্ধ রাখায় পাটের বাজারমূল্য কমে গেছে বলে মনে করছেন এ অঞ্চলের কৃষক ও পাট ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা না থাকায় এখানকার হাট-বাজারগুলোতে পাট কেনা বেচা প্রায় বন্ধ রয়েছে। এ বছর সরকার পাটের মূল্য নির্ধারণ করেছে মন প্রতি ১৭০০ টাকা। মৌসুমের শুরুতে প্রতিমন তোষা পাট বিক্রি হয়েছে ১৫০০ তেকে ১৬০০ টাকায় আর মধ্যম শ্রেনির পাট বিক্রি হয়েছে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকায় । এক মাসের মাথায় পাটের মূল্য কমতে শুরু করে। বর্তমান প্রতি মন তোষা পাট বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। আর মধ্যম মানের পাট বিক্রি হচ্ছে মন প্রতি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়। পাট ব্যাবসায়িরা বলছেন, বিজেএমসি’র পাটকলগুলো পাট কিনলে চাহিদা বাড়ত। কৃষকও ন্যায্য মূল্য পেত । 

মাদারীপুর সংবাদদাতা জানান, মাদারীপুর সদরসহ অন্যান্য উপজেলায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় দুই হাজার হেক্টর বেশি। আর এতে ফলনও হয়েছে বাম্পার। কিন্তু  জমিতে পাট চাষ ও ফলন ভালো হয়েছে। যেখানে এক মন পাট চাষ করতেই ব্যয় হয়েছে দেড় হাজার টাকা, সেখানে মন প্রতি পাট বিক্রি করতে হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪০০ টাকায় টাকা। কৃষকরা হতাশ হয়ে পাট চাষ না করে অন্য ফসল করার চিন্তা ভাবনা করছে। মিল মালিকরা পাট ব্যবসা ও রফতানিতে অনিহা করছে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু দাম কমাচ্ছে। সরকারি পাট ক্রেতারা যদি ঠিকমত টাকা দিতো বা সঠিক দাম দিতো তাহলে হয়তো কৃষকরাও বাচতো ব্যবসায়ীরা বাঁচত। এমতাবস্থায় সরকার কৃষকদের কথা ভেবে নির্ধরিত মূল্য ঠিক করে দেয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ফরিদপুর সংবাদদাতা জানান, মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির অভাবে সেচ দিয়ে পাটের আবাদ করতে হয়েছে। আর সেচ দিতে গিয়ে ডিজেল ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ ব্যয় করতে হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ গেছে বেড়ে। কিন্তু বাজারে পাটের দাম কম। এ অবস্থায় লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচ উঠানোই দায় হয়েছে।

ময়মনসিংহ সংবাদদাতা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবছর পাটের ফলন ভাল হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে লোকসান দিয়ে পাট বিক্রি করা ছাড়া কোন উপায় নেই। কারণ তারা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পাটের আবাদ করেছে। পাট বিক্রি করে তা শোধ করতে হবে। প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে খরচ পড়েছে ১৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে মান ভেদে ১৪৫০ থেকে ১৬০০ টাকা দরে পাট বিক্রি হচ্ছে।

পাবনা সংবাদদাতা জানান, চলতি বছর জেলায় ৪৫ হাজার ৭৪ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। আর এ থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার বেল। উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাট আবাদ হয়েছে সুজানগরে। এ উপজেলায় ১০ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া সদর উপজেলায় ৯ হাজার ২৫০ হেক্টর, আটঘরিয়ায় ৪ হাজার ৮২৮ হেক্টর, ঈশ্বরদীতে ৫১১ হেক্টর, চাটমোহরে ৮ হাজার ৫৯০ হেক্টর, ভাঙ্গুরায় ৬৫০ হেক্টর, ফরিদপুরে ৭১০ হেক্টর, বেড়ায় ২ হাজার ৫১৫ হেক্টর ও সাঁথিয়া উপজেলায় ৭ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এখানে কৃষকরা অন্যান্য স্থানের চেয়ে একটু ভাল দাম পাচ্ছে। তবে সে ক্ষেত্রে কেনো ভাবে খরচটা উঠিয়ে নিতে পারছে। তবে লাভের মুখ দেখছে না। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক চৈতন্য কুমার দাস বলেন, কৃষি বিষয়টা সম্পূর্ণই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এ বছর পাটের জন্য আবহাওয়া অত্যন্ত উপযোগী। তা ছাড়া বীজ ভাল থাকার কারণে রোগবালাই ছিল না বললেই চলে। ফলে ফলনও খুব ভাল হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে কৃষকদের খরচ বাঁচাতে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে আঁশ ছাড়ানোর পরামর্শ দেয়াসহ পাট চাষে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে পাটের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু কষ্ট করে ফসল ফলালেও ভাল দাম পাচ্ছে না বলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিযোগ আসছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যেও বিক্রি করতে হচ্ছে। 

প্রতি বছর এভাবে মূল্য কমে যাওয়ায় পাটের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, কৃষকরা সাধারণত যে জিনিসের দাম পাবে তারা সে জিনিস চাষের দিকে ঝুকবে আর দাম না পেলে তা থেকে অন্য দিকে মনযোগী হবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, আমাদের দেশে আবাদি জমির সংখ্য দিন দিন কমে যাচ্ছে। তা ছাড়া কৃষকরা তাদের ফসল কাটার পরে গুদামজাত করে রাখতে পারছে না এবং সরকারও বেশি মূল্যে কিনতে পারছে না ফলে বাধ্য হয়ে এগুলো চলে যায় স্বার্থন্বেষী একটি মহলের হাতে। যার জন্যে কৃষকদের এগুলো চাষ থেকে ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ন্যায্যমূল্য পেলেই কৃষক পাট চাষের দিকে ঝুঁকবে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। অন্যথায় পাট চাষ করা থেকে কৃষকরা এক সময়ে মুখ ফিরিয়ে নিবে বলে জানান তিনি। 



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


কাগজে যেমন ওয়েবেও তেমন
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সোস্যাল নেটওয়ার্ক
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
মেসার্স পিউকি প্রিন্টার্স, নব সৃষ্ট প্লট নং ২০, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং ৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত।
বার্তা বিভাগ : ৯৫৬৩৭৮৮, পিএবিএক্স-৯৫৫৩৬৮০, ৭১১৫৬৫৭, ফ্যাক্স : ৯৫১৩৭০৮ বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন ঃ ৯৫৬৩১৫৭
ই-মেইল : bhorerdk@bangla.net, adbhorerdak@gmail.com,  Developed & Maintenance by i2soft
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি