আজ বুধবার, ৪ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১৭ জানুয়ারী ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ
ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ
শিরোনাম : ৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দেয়ার নির্দেশ       ডিএনসিসির উপ-নির্বাচন স্থগিত       কলম্বিয়ায় সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত : নিহত ১০       রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তির বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের গভীর উদ্বেগ       উত্তরা মেডিকেলের ৫৭ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমে বাধা নেই       না.গঞ্জে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত দুই       শাহজালালে ৩১৮ কার্টন সিগারেট জব্দসহ আটক ২      
সুইমিং পুলের জন্য ৮ আমলার বিদেশ সফর হাস্যকর!
Published : Tuesday, 12 December, 2017 at 12:45 PM, Count : 84
সুইমিং পুলের জন্য ৮ আমলার বিদেশ সফর হাস্যকর!মীর আব্দুল আলীম : সরকরি অর্থে বিদেশ সফর নিয়ে পত্রিকার শিরোনাম এমন-“এক সুইমিং পুল রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণে ৮ কর্মকর্তা যাচ্ছেন বিদেশ সফরে”। বার হাত কাকুড়ের তেরো হাত বিচি। এই অবস্থা। সংবাদে বলা হয়, নভেম্বর মাসের ১২ তারিখ বঙ্গভবনের সুইমিং পুলটি চালু হওয়ার পর তার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে ইউরোপের তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ৮জন কর্মকর্তা। যাকে সংশ্লিষ্ট স্থপতিই সরকারি 'অর্থের অপচয়' বলে মনে করছেন। বঙ্গভবনের রেসিডেন্স ব্লকের সুইমিং পুলের রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণের জন্য ৮ কর্মকর্তারা ১ সপ্তাহের জন্য জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই হাস্যকর এবং পিড়াদায়ক।

মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে সরকারের নীতিমালা বা নির্দেশনা রয়েছে। সেইসব নিয়মনীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না বলে প্রায়শই পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হচ্ছে। 'প্রকল্পের অর্থে বিদেশ সফর', 'সরকারি টাকায় ব্যক্তিগত বিদেশ সফর', 'মন্ত্রণালয়ের টাকায় ১৫ সংসদীয় কমিটির বিদেশ সফর', 'শিক্ষা সফরের নামে ২০ কর্মকর্তার থাইল্যান্ডে প্রমোদ ভ্রমণ!' এ জাতীয় সংবাদগুলো সত্যিই সুখকর সংবাদ নয়।

বঙ্গভবনের সুইমিং পুলটি চালু হওয়ার পর তার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে ৮ কর্মকর্তার সফরের সরকারি আদেশ (জিও) গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জারি করেছে ১৪ নভেম্বর। সরকারি এ আদেশ থেকে জানা যায়, 'কনস্ট্রাকশন অব সুইমিং পুল অ্যান্ড আদার রিলেভেন্ট সার্ভিসেস ইন দ্য প্রিমিসেস অব বঙ্গভবন' প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ব্যয় বহন করা হবে। এ সফরের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে।  তিনি বলেন, যেসব সিস্টেম এখানে রাখা হয়েছে, সেগুলো আমাদের দেশে নতুন। এগুলো কীভাবে অপারেট করবে, তা আমরা জানি না। এজন্য বিভিন্ন দেশের সুইমিং পুল কীভাবে অপারেট করে, সেটা জানতে হবে। না হলে এটা ডিসঅর্ডার হয়ে যাবে। একটি সুইমিংপুলের অপারেটিং শিখতে এত জন দক্ষ প্রকৌশলীকে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড যাওয়ার বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের সফর অর্থের অপচয় বলে বক্তব্য দিয়েছেন। যা অধিকাংশ পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে। তিনি বলেন, সুইমিংপুল কোথায় করা হচ্ছে, মাটিতে নাকি ওপরে সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে সুইমিং পুলের নকশা হয়ে থাকে। আমাদের এখানে ধুলো বেশি। সেই সঙ্গে অন্যান্য বায়ুবাহিত আবর্জনা থাকে। বলাই বাহুল্য এসব দেশ পরিদর্শন করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে আধুনিক মানের সুইমিং পুল রয়েছে। এধরনের কাজে ওই পেশাজীবীদের যুক্ততা থাকলেই যথেষ্ট। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ আনা যেতো, কিন্তু তা করা হয়নি।

বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থে বিদেশ সফর নিয়ে সরকার সংশ্লিষ্টদের মতামত বরাবরই উপেক্ষিত হচ্ছে। এর আগে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর বলা হয়েছে, 'মন্ত্রণালয়ের টাকায় সংসদীয় কমিটির বিদেশ সফর নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়'। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, 'মন্ত্রণালয়ের টাকায় সাংসদদের বিদেশ সফরে আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে'। অর্থমন্ত্রী বরাবরই মন্ত্রণালয়ের টাকায় সংসদীয় কমিটির সদস্যদের বিদেশ সফরকে নিরুৎসাহিত করেছেন।

খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক সভায় তাঁর এক বক্তব্যে বলেছিলেন, প্রকল্পের অর্থে বিদেশ সফরের সুযোগ না থাকলে সেই প্রকল্প একনেক সভায় উপস্থাপিতই হয় না। সেখানে দেশের উন্নয়ন বিবেচনা প্রাধান্য পায় না। এমনকি বিদেশ সফরের সুযোগ না থাকলে প্রধানমন্ত্রীর নিজের আগ্রহের প্রকল্পও মূল্যায়িত হয় না। তিনি আক্ষেপ করেন এই বলে যে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরসংক্রান্ত ফাইলের অনুমোদন পেতে যত তদবির চলে, দেশের উন্নয়ন বা জনস্বার্থ বিবেচনায় কোনো ফাইলের জন্য তা করা হয় না। প্রধানমন্ত্রীর এই আক্ষেপে জন মানুষের আক্ষেপেরই প্রতিফলন ঘটেছে। তারপরও এ ধরনের সফর বন্ধ হচ্ছে না। উল্টো কীভাবে বেশি বেশি বিদেশ সফরে যাওয়া যায়, তা নিয়ে নাকি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়। তাই সরকারি অর্থে বিদেশ সফর কিছুতেই সীমিত হয় না। বরং এখনো যেসব সদস্য কমিটির মাধ্যমে বিদেশে যেতে পারেননি, তারা মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন।

পত্রিকান্তে জানা যায়, যে যেভাবে পারছেন বিদেশ সফরের কর্মসূচি বাগিয়ে নিচ্ছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব থেকে শুরু করে প্রশাসনের মূল কর্তাব্যক্তি সচিব পর্যন্ত প্রত্যেকেই বিদেশ যাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বিশেষ করে প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবানরা সফর প্রস্তাব আসার সঙ্গে সঙ্গেই লুফে নিচ্ছেন। এমনকি কারো কারো মধ্যে বিদেশ সফরের প্রবণতা এক ধরনের বাতিক রোগ হয়ে দাঁঁড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বিদেশ থেকে ঘুরে আসার আগেই আরেকটি সফর কর্মসূচি তৈরি করে রেখেছেন। কোনো কোনো কর্মকর্তার বছরে ১২ বারেরও অধিক বিদেশ সফরের রেকর্ড রয়েছে। এসব সফরে তার যাওয়া উচিত কি, উচিত না- নীতিমালায় পড়ে কি না- কিছুই বিবেচনা করছেন না। যেসব সফরে সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে এবং অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দিতে বলা হয়েছে সেগুলোতেও অহরহ সিনিয়র কর্মকর্তা অর্থাৎ সচিবরা যাচ্ছেন। কোনো বাছবিচার নেই। এমনকি বিদেশ সফর নিয়ে নানান লুকোচুরিও চলছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যে শাখা থেকে সফরের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা সেটি এড়িয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অন্য শাখা থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে। যাতে সরকারের খাতায় বিদেশ সফরের সঠিক হিসাব না ওঠে।

নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগত কারণে তিন বছর পর ৩০ দিন এবং দাপ্তরিক কাজে বছরে ৪ বারের বেশি বিদেশ সফর করতে পারবেন না। বিদেশ সফরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও বিধান থাকছে। দাপ্তরিক কাজে বিদেশে গেলে তার সর্বোচ্চ সময়সীমা হবে ১০ দিন। বিদ্যমান বিধিমালায় বছরে ৬ বার সরকারি খরচে বিদেশ সফরের নিয়ম রয়েছে।

এছাড়া ব্যক্তিগত কারণে তিন বছর পর ৩০ দিন ছুটি নিতে পারেন তারা। এমন নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না। প্রশিক্ষণ বা সরকারি কাজে কর্মকর্তারা বিদেশে যাবেন এটা ঠিক, তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এ সুযোগ বেশি নিলে, তা খুবই দূঃখ জনক কথা। কর্মকর্তারা যত দক্ষ ও অভিজ্ঞ হবেন, যত বেশি প্রশিক্ষণ পাবেন, প্রশাসনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিদেশ ভ্রমণ মন্দ নয়। তবে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে যে বিতর্ক তাতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় সব।

আমাদের মতো দরিদ্র রাষ্ট্রে এমপি-আমলাদের ঘন ঘন সরকারি অর্থে বিদেশ সফর কতটা যৌক্তিক? উন্নত দেশগুলো কীভাবে চলে তা দেখতে এবং শিখতে বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে সময়টা সফর আর ভ্রমণের অনুকূলে নয়। তলিয়ে দেখলে বেরিয়ে আসবে বিগত মাসগুলোয় দেশের রেমিট্যান্স বেড়েছে খুবই সামান্য, আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, বৈদেশিক লেনদেনে তৈরি হয়েছে ভারসাম্যহীনতা। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে তো কমছেই। দেশে চলছে বিনিয়োগ খরা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এসইসি এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার কারণে শেয়ারবাজারে ইতোমধ্যেই বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে। ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থায়ও থেমে নেই এমপি, মন্ত্রী, আমলাদের বিদেশ সফর। কারণে-অকারণেও হচ্ছে এমন সফর। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বারবার সতর্কতামূলক চিঠি দেয়ার পরও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর। সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সফরের কারণে বিদেশ সফরে বরাদ্দের টাকায় টান পড়ছে। এক বছরের টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে কয়েক মাসেই। এজন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হচ্ছে সরকারকে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় সেমিনার ও অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বিদেশ সফরেই উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের আগ্রহ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়ে যাওয়ার পরও সরকারি কর্মকর্তারা ওই প্রকল্পের অজুহাতে বিদেশ সফর করছেন। এমনকি মন্ত্রীদের চেয়েও বেশি বিদেশ সফর করেছেন এমপি এবং মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তারা।

দরিদ্র দেশের অতি সাধারণ জীবন যাপন করা মানুষের অর্থে লালিত রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা জনস্বার্থ বা রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করবেন এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ব্যক্তিস্বার্থ বা নিজ স্বার্থের কাছে অন্য সব স্বার্থ স্লান হয়ে যায়। অতিসম্প্রতি বঙ্গভবনের রেসিডেন্স ব্লকের সুইমিং পুলের জন্য প্রশিক্ষণের জন্য ৮ কর্মকর্তারা ১ সপ্তাহের জন্য জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড যাওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রিয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। এ জতিয় অপচয় রোধে করা জরুরী। জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকার সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : মীর আব্দুল আলীম 


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


কাগজে যেমন ওয়েবেও তেমন
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সোস্যাল নেটওয়ার্ক
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
মেসার্স পিউকি প্রিন্টার্স, নব সৃষ্ট প্লট নং ২০, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং ৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত।
বার্তা বিভাগ : ৯৫৬৩৭৮৮, পিএবিএক্স-৯৫৫৩৬৮০, ৭১১৫৬৫৭, ফ্যাক্স : ৯৫১৩৭০৮ বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন ঃ ৯৫৬৩১৫৭
ই-মেইল : bhorerdk@bangla.net, adbhorerdak@gmail.com,  Developed & Maintenance by i2soft
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি